রায়হান রাইন এর কয়েকটি নস্টালজিক বোধ

*
রম্বসের কর্ণ ধরে যতই তুমি টানা-হেঁচড়া করো, সে তার সমদ্বিখণ্ডিত করার নীতি থেকে সরে আসবে না।

*
তুমি কি কখনো হতে পারবে দ্বিঘাত সমীকরণের ভেতর লুকিয়ে থাকা শূন্য, যা সবকিছুর মূল্য ধার্য করে?

*
আমি কখনোই লসাগু হতে চাই না। তুমি নিজেই গসাগু হয়ে আমাকে ঐ প্রান্তে ঠেলে দাও। শুধু একটা গোপন সমঝোতা আমাদেরকে টিকিয়ে রাখে, আমরা পরস্পরকে ক্ষমা করে যাই।

*
দেখলেই বোঝা যায়, কে নির্ণায়ক। ধোপ-দূরস্ত পোশাক, চোখের ভেতর পুষে রাখা সংশয়। এ নিয়ে উৎপাদকের কোনো মাথা-ব্যাথা নেই। তার কিছুই করার নেই নিজের কাজটুকু করে যাওয়া ছাড়া। কখনো মনে হয়, এই শ্রমিকেরা বীজগণিতের রাশি, আলফা বিটা বা গামার মতোই অনির্দিষ্ট আর ঈশ্বরের মতো নির্বিকার।

*
ভাগশেষগুলো দেখতে কী করুণ, প্লেটে কিংবা টেবিলে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্টের মতো।

*
লব আর হর পরস্পরকে দেখে বটে, কেউ কাউকে ছুঁতে পারে না। ভেতরে ভেতরে ঈর্ষায় পুড়তে থাকে সমান না হতে পেরে। চির-প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুজন যেদিন পরস্পরের সমান হয়, সেদিন কারো অস্তিত্বকেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না, দুজনে মিলে যায় একদেহে।

*
সমীকরণ সবার অগোচরে থাকে। সে আছে বলেই উচ্চনিচ, বিবাদ-বৈষম্য, এইসব আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু কিছুই সমান নয়। সে যেন কোথাও নেই, অথচ আছে যেন।

*
কোনো একদিন ঝড় তুলবে বজ্রগুণন। জায়গা বদল করবে উচ্চ আর নিম্নবর্গেরা, সেইদিন গুরু আর চণ্ডালে একপ্লেটে ভাত খাবে। এক গোপন শূন্যের সঙ্গে লড়াইয়ে মেতে উঠবে বিপ্লব।

*
স্থানাংককে কেউ কেউ মৌলবাদী বলে। আসলে তিনি নীতিশাস্ত্রে পণ্ডিত। সবকিছুকে ডান আর বাম দিয়ে বুঝে থাকেন।

*
পৌনপুনিক কখনোই ঘুমায় না। এদের ধারণা এরা অনন্তকে বোঝে। সাধুসন্তদের সাথে এদের ওঠাবসা। চোখে মুখে খানিকটা সন্ন্যাসভাব আছে।

*
সেইসব স্টেশন পেরনো ট্রেন, সুদখোর, তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওঠা বানর, বয়স হওয়া বাবা-মা-ভাই-বোন যারা ক, খ কিংবা গ-এর মতো রাশিমালা তাদের খুব নিকটেই থাকে শূন্য কিংবা অনন্ত। এরা আমার বয়সের মতো, প্রতিদিন বিনিময় করে চলে এক আর শূন্যের ভেতর।

এই লেখাগুলো ভাল লাগায় রায়হান রাইন’র facebook সাইট থেকে এখানে আনি ।

ফে র দৌ স মা হ মু দ এর তিনটি কবিতা

কাজের বাক্স, ক্ষুধার শরীর

 

কাল রাতে পশুরা বেরিয়েছিল

খাবারের খোঁজে; ওরা

তোমাকে খুঁজে পায়নি

তুমি লুকিয়েছিলে ক্যাঙারুর

                         থলিতে।

অথচ

মানুষের মতো দেখতে শিকারিরা ঠিকই

খুঁজে পেলো তোমাকে;

তুমি বললে ‘ভরপেট শিকারিদের ঘৃণা করা

                          আমাদের কতব্য’

ওরা তোমার মায়ের মতো

ক্যাঙারুকে করলো হত্যা

উদীয়মান সূর্যের লালে।

 

দাগ

গ্রীষ্মের শহরে মাটির যন্ত্রণা জুড়োবার বৃষ্টি চাই

           বালিতে লেগে আছে কাউকে বিদায় দেয়ার দাগ;

দাগ দেখে কি করুণ গানের পেছনে তাকানো সম্ভব?

       চলো, সার্কাসের বাঘের পিঠে চড়ে পালাই অতলের কূপে

গাছে গাছে ঘুরছে অসময়ের ঝাঁপি খোলা ঘূর্ণিঝড়;

আয়ু ছুটছে পাখির বিষাদে বাতি জ্বালাতে

        মৃত্যুর পাঁচালিকে চাইলে ছুঁতে জ্বলে উঠছে আগুন!

তুমি থেকো নিশ্চিন্তে, তোমাকে ঠিকই রেখে দেব

           পোকা কাটা পাতা থেকে এনে আকাশের বুকে।

ধূলোর বিন্দুতে জীবিতের কবরগুলো হয়ে উঠছে ফুল ও ফলের ছাই।

 

ডাকঘরেরপায়েরনিচে

বৃদ্ধ একটি সূর্য বসে আছে আমার ঘরে চেয়ারে হেলান দিয়ে,

তাকে শোনাচ্ছি ক্যাসেটে বাজিয়ে ঝলমলে হাততালি

নিচ্ছি সবুজ রঙের বিশ্রাম ঘাস বিছানো কার্পেটের উপর

মাটিতে দাঁড় করিয়ে লাল স্কুল।

তোমাকে আর আমি কবিতা দেখাব না, তুমি যত না পাঠক

তার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছো কাব্যসমালোচক।

 

লেখাটি প্রকাশিতহয়

হরমা’ প্রথম বর্ষ  সংখ্যা-১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮

প লা শ দ ত্ত এর কবিতা কবিপ্রিয়অন্ধকার

তারপর থেকে আমি প্রতিরাতে বসি। আর লেখার চেষ্টা করি। কিন্তু কবিতা বিষয়ক কোনো কথাই আমার মনে আসে না। শুধু নিরেট রাতকে মনে হয় কবিতার সঙ্গে অপার সম্পর্কের কোনো প্রাণ। ধরতে পারি না। ধরতে পারি না। ধরতে পারি না। কবিতার সঙ্গে রাত্রির অন্ধকারের সম্পর্কের চেহারাটা কিছুতেই ধরে উঠতে পারি না। শেষকালে অন্ধকারকে নিয়ে এই কথাগুলো কোত্থেকে কীভাবে বের হয়ে আসে। দাঁড়িয়ে যায়। জানি না। আপনার রুচিমাফিক হলো কি না। তবু অন্ধকারের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে আমি এই রাতকথাগুলি ফেলে দিতে পারি না। মনে হয় কবির এই অন্ধকারকে কবিতার এই অন্ধকারকে হয়তো আপনি ভালোবাসতেও পারেন।

 

নিজেকে উদ্যাপন রাত। নিজেকে উদ্যাপন রাতের অন্ধকার। রাতে আমার অতীতের ইতিহাস মনে পড়ে। রাতে আমাদের অতীতের ইতিহাস মনে পড়ে। নিজেকে শুধরে নেয়ার কোনো সুযোগ সেই স্মরণে নাই। শিলংয়ের মেঘ তখনো আমাদের নিজের নিজের সঙ্গী কি? আমি ৪২৭ নম্বর বিছানায় শুয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে আছি রাতে। অন্ধকারে। শিলংয়ের গাড়ির হেডলাইট এই আলো নেভানো রাতে। ঢাকাশহরে। হুইটম্যান সাহেব, কবি, কবি নিজেকে উদ্যাপন করতেছে। এখন তারা অন্ধকারের আশায় বন্ধ ঘরের ছাদের দিকে তাকায়ে থাকবে। আপনি কি দেখতেছেন?

 

পাহাড়ের ওপর ঝুলে থাকা আকাশে যতো তারা কবিদের মুখের দিকে। চেয়ে থাকার অভ্যাস রপ্ত করে। ওই আকাশে এই যাত্রায় নিজেদের উদ্যাপন সাঙ্গ হবে। কবি কি তখনো জানে ওইখানে তার আর বেশিদিন থাকা হবে না? জানে সে ওইখানে আজীবন থাকিবে? চার দেয়ালের ওপর ওই তারাবৃন্দ অন্ধকারের সুবাদে—লাইট নেভানো অন্ধকারের সুবাদে—হানা দিয়ে দিয়ে যাবে।

 

প্রত্যেক রাতে মনে পড়তে পারে ফেলে আসা জীবনের কথা। দিনের বেলা ওইসব জীবনের ফাঁক অলীক বাস্তবতা বুঝে ওঠা যায়। কিন্তু রাতে তা নেশার মতো। বাস্তব বাস্তবতার মতো। অন্ধকার কী করে সময়কে এতোটা কাছে এনে দেয়? সময় কাছে এলেই বা কী রকমে এতোটা সশব্দ হয়ে ওঠে?

২.

অন্ধকারে অনেক কথা মনে পড়ে। অন্ধকারে অনেক কথা মনে হয় সত্য। নিরেট অন্ধকার দ্যাখা কতোটা সৌভাগ্য? নিরেট অন্ধকার দ্যাখার সুযোগ কতো? এখন তোমার অন্ধকার ছাড়া নিজের সময় নেই। সারাটা দিনের শেষে একমাত্র বাতি নিভলেই সূর্য ডুবলেই দ্যাখা হচ্ছে নিজের সঙ্গে। অন্ধকারে ইচ্ছে হয় উঠে বসি। তারপর হই দিনের মতো দ্রুত।

 

কিন্তু দিন যেভাবে গ্রাস করে রাখে কবিকে অন্ধকারকে কী করে সেই মুক্তি আমাকে দেয়? কবিতা কি তবে অন্ধকার-প্রিয়? জেনে গেছি সমস্ত রাত পৃথিবীর মতো ফলপ্রসূ ছিলো কবিতার জীবনে। জেনে গেছি কাম দুর্দান্ত সুস্বাদ প্রতিবন্ধক ছিলো কবিতার ময়দানে। বয়সী অন্ধকারের ছায়ায় কবি তাই আদ্যন্ত বসে থেকেছে ধ্যানত্রস্ত। ঋষি।

 

অন্ধকারের প্রতীক্ষায় কবির প্রার্থনা আমরা দেখিনি তেমন দুর্ভাগ্য। আমরা তবে বিষবিস্তারী অন্ধকারকে ছুঁয়ে দেখবো না বন্ধু! আমরা কি রাত জেগে মুখোমুখি কথা বলি প্লাতেরো? আমরা কি মহাশূন্য-আঁধারে স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎমালা!

 

আরো কোনো কবি অন্ধকারে দেশে ফিরে যাচ্ছে। কার চোখে ধসে পড়তেছে তুষার। কে চোখ বন্ধ করে চেয়ে আছে আকাশের দিক। এইসব কাম দূরে ঠেলে রাখা রাত এইসব সমূহ ক্রমশ দেশে ফেরা নিজস্ব রাতে-পৃথিবীর হিসেবে এইসব অনেকের পাপের দিকে টানছে। কবি কি তবু অন্ধকার?

কবি কি তবু একাএকা?

 

আমার অন্ধকার এখন দিনের স্বচ্ছ আলো। অন্ধকার এখন স্পষ্ট হাত ধরে ফেলছে আমার যতো চেনা মানুষের। এখন তবে রাত আর দিনে আমাদের তফাৎ নেই কোনো? আরো এক দফা আমরা মিথ্যের দিকে যাবো? জগতে যা কিছু বাস্তবিক ঘটে তাকে বলবো অন্ধকার—কবিতার ঘোড়াশালে। বলবো ওইখানে নিখাদ কল্পনাই আলো। পৃথিবী গোলাকারে ঘোরে বলে মানুষ অন্ধকারকে ভুলে গেছে। ভালোবেসেছে নিঃসংকোচে আলো। শুনেছে অন্ধকারে এই পৃথিবী নাকি আদিম ছিলো। ওইদিকে অন্ধকারেই গোটা পৃথ্বীজুড়ে মানুষ বসে পড়ছে কল্পনায়-কল্পনায়—আরো কিছু অধরা রয়ে গেছে বলে।

 

কবি তুমি অন্ধকার ভালোবাসো। ওইখানে প্রাণের অজানা উদ্ভাস বলে। শরীরে শরীর মিলে প্রকৃতই প্রাণ। কেবলি প্রাণ। প্রয়াসশূন্য এ অঙ্কুর আনন্দ আনন্দ।

 

দায়িত্ব পেয়ে আলোক সরকার বৃষ্টির পর রাস্তায়; অলোকরঞ্জন তাকে বন্ধুশ্রদ্ধাবশে ছেড়ে দিলেন তুষারের বনে। এইসব অজানা আপ্লব সূর্যের নাম জানে না। দিনে কি রাতে যখনি এ-খবর মানুষের কাছে যাচ্ছে তখন এসে ভর করতেছে অখ- নীরবতা। তাকে মানুষ জেনেছে রাত্রির নামান্তর। এই জানা নিশ্চিত মানুষের দোষ—সে যদি নীরবতায় আঁধারের সুমহান প্রান্তর দ্যাখে; দেয় কী করে কবি চাপায়ে রাত্রির কিবা অন্ধকারের ঘরে? তবু সব অন্ধকার কি ওইরকম সোনালি ও সফল? আমরা তো জানি পৃথিবীর বাতাস দিনে-রাতে একই ভরপুর অক্সিজেন অক্সিজেন। তাহলে অন্ধকারকে কেনো ভয় পায় পৃথিবীর মানুষ? কেনো অন্ধকারে অস্বস্তি এইসব মানুষের?

 

এখন অন্ধকার। ঘুমোতে চলে যাচ্ছে কে কে? আমরা তাদের বাঁচানোর শিখরে দাঁড়াবো। দেখবো সে কী কী ভাবে ওই ঘুমের আগে। দেখবো সে কেমন ছটফট আয় ঘুম আয় ঘুম করে অন্ধকারে। কিন্তু আমরা তো সব সাধারণ, কবি কোথায় কবি? তাকে এইসব অন্ধকার উপহার দেয়া যাক। দেয়া যাক নির্ঘুম আরো শতসহস্র রাতগুলি।

 

এই যেমন এখন শুধু দ্যাখা যাবে কাছের যতো জিনিস। মনের যোগ কাছের কাছের বন্ধুতে। অথচ হৃদয়। আলোকের মতো দ্রুতিমান।

 

ওরা কবি। অন্ধকার ওদের আপ্রাণ প্রিয়।

 

লেখাটি প্রকাশিতহয়

হরমা’ প্রথম বর্ষ  সংখ্যা-১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮

শেখ লুৎফর’র গল্প অস্তিত্বে অন্য মুখ

অস্তিত্বে অন্য মুখ

এত অন্ধকার, এত কর্দমের জল

মানুষ যে, চোখের থেকে ফেলে নাই আঁজলাপুর আলো

উপরন্তু আরো কিছু আন্ধিয়ার ফেলে ফেলে

অভোলা হাওয়ার মতো ক্রীড়ার ভেতর…

টুল্লুক : মোস্তাক আহমাদ দীন

শরীরে সিফিলিসের ক্ষতের মতো অসংখ্য নয়া-পুরান সাইনবোর্ড নিয়ে, পাকা সড়কের মোড়ের বিশাল শিরীষ গাছটা, স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ২/১টা পুরোনো সাইনবোর্ডের বুক, জঙ্গারে খেয়ে খুবলে ফেলেছে। কিন্তু পেরেকের কঠিন দাঁত, শিরীষের গতর কামড়ে ধরে এখনো তাফালিং করছে। বিচিত্র বিজ্ঞাপনগুলোর উজ্জ্বল শরীরের নিচে চাপা পড়া, শিরীষের সেইসব গোপন ক্ষত থেকে, চুঁয়ে-চুঁয়ে দিনমান শুধু রক্ত ঝরে।

শিরীষের কোমর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মুনিম অপেক্ষা করে, একটা রিকশার জন্য। কত বছর ধরে যে সে এই শিরীষের নিচে অপেক্ষা করছে। স্কুলের ছুটির দিনগুলো, ভরদুপুরে একা-একা বাড়ি থেকে বেরিয়েই সে চম্পট দিতো, লকলকে কচি শিরীষের চারাটাকে ঠার করে। দোকানের ঝাঁপ ফেলে বাবা বাজার থেকে এলো বলে—নিশ্চয়ই তার জন্য বাদাম-বিস্কুট আনবে। ধুলোভরা ধু ধু পথটার দিকে চেয়ে চেয়ে মুনিমের চোখ টাটাতো। কত মানুষ আসে-যায়, বাবা কেন আসে না এখনো? বিশাল মাঠের বুক চিরে মাটির সড়ক গঞ্জের দিকে মুখ লুকিয়েছে। দূরে দূরে ছিন্ন গ্রামগুলোর কালচে রেখা, মাঝ দুপুরের ঠাঠা রোদের তেজে হঠাৎ হঠাৎ কেঁপে ওঠে। মুনিম আর তার মাথার উপর ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা কচি শিরীষের আধলা পরাণে, ডর ধরাতে ২/১টা হিয়াল তার কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে, আশপাশের ঝোঁপ থেকে একটু একটু মুখ বের করে ভেংচি মারে।

চারপাশের গ্রামগুলো থেকে আল-বাতর বেয়ে বেয়ে মুনিমের বয়সি যারা, স্কুলে যাবার জন্য আসতো তারা প্রত্যেকেই এই শিরীষতলায় এসে অপেক্ষা করতো। ৪/৫ জন হলে হৈ হৈ করে সড়কের ধুলো কিম্বা কাদা ঠেলে স্কুলের দিকে ছুটতো। রজব, রেহান, উমর…, মুনিমের বুকে কত নাম; মাঝে মাঝে অনাহক বিখাউজের মতো চুলকায়। উমর কথা বলতো গমগম করে, তাই সবাই তাকে ভোমা উমর ডাকতো। আঙুলের মতো বড়ো বড়ো দাঁত আর বাঘা কব্জির উমর, ডাকাতি করতে গিয়ে পাবলিকের ব্যারিকেডে পড়ে, দশ সন আগে খুন হয়ে গেছে। রজব রেলের খালাসি। ঈদ-পরবে ছুটিতে বাড়ি এলে মুনিমের আড়তে এক-আধ চক্কর আসে। পোশাক-গতরে অনটনের প্রকট উপস্থিতি, চোখে-মুখে পৌষের সন্ধ্যার মতো জড়তা, কষ্ট।

আড়তের পিচ্চিটা দু-কাপ চা আনে। মুনিম টোস্টে কামড় দিয়ে মরা চোখে পুরানা বন্ধুর দিকে চেয়ে থাকে। চায়ের গরম শরীর থেকে উঠে আসা ধোঁয়া দুজনের মাঝে ইন্দুরের মতো ল্যাজ নাড়ায়।

চা শেষ হয়ে গেলে রজব উঠতে চায় না। মুনিমের শরীর খিতখিত করে। খাতক কেউ এলে তার জানটা বুঝি বাঁচে।

মুনিমের আড়ত ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেলে সে চেয়ে দেখে বাইরে রাত আলকাতরার মতো ঘন হয়ে গেছে। খাতকশূন্য এরকম স্তব্ধ ঘরে, নিজের অস্তিত্বের বাসি ঘ্রাণে তার নিজের বুকটাই বিলবিল করে ওঠে। তখন সে বুকের কাঁচা-পাকা লোমে নখ ডুবিয়ে চুলকাতে চুলকাতে আরেকবার বাইরের দিকে চোখ পাকায়। আরো আশ্চর্য কোনো অন্ধকারের আগুনে মুখ ডুবিয়ে পরে থাকার একটা উৎকট লোভ তখন হু হু করে ডাঙ্গর হয়।

রিকশার চাকা পনপন করে ঘোরে। রাস্তার পাশের আতংকিত গাছগুলো, অন্ধকারকে আঁকড়ে ধরে নিজেরাই গভীর অন্ধকার হয়ে যায়।

সড়কের দু পাশে বিস্তীর্ণ জমিন। ছোট-বড় আল-বাতর তুলে মানুষেরা অসীমকে আয়ত্তের মধ্যে কব্জা করে নিয়েছে। জোর বাতাস গ্রামের ঘর-ঘুপচি, বাঁশবন পেরিয়ে বিশাল মাঠে পড়ে খ্যাপার মতো দৌড় লাগায়। তখনো চৈতে, রুখু-শুখা মাঠের ধুলো-নেড়া নিয়ে টানাটানি করে। আকাশের জ্বলন্ত সূর্যটাকে থাপা দিয়ে ধরে কচলে অন্ধকারের কালো কালো গুঁড়োকে যেন চারপাশে ছড়িয়ে দেয়। দিগন্তের উদলা কোনাকানা থেকে কালো মেঘ, কার যেন তাড়া খেয়ে ভেংচি কেটে তামাম দুনিয়াটাকে ঝলসে দেয়। এলেবেলে বাতাস খেলতে খেলতে এক সময় নেকড়ের মতো দুর্ধর্ষ আর একরোখা হয়ে ওঠে।  কোনো কোনো দিন যদি মুনিমকে ধরতে পারে, তবে তারা রিকশা-সমেত লোকটার ওপর হামলে পড়ে।

প্রবল ক্রোধে মুনিমের বাক রোধ হয়ে আসে। নিজের ঘরে সে ধীরাজ; আড়ত, ইট ভাটা, অটো রাইছ মিলে প্রভু; আর এই ছোট থানা সদরের যে কজন সেরা হাড়কিপ্টে ক্যাশওয়ালা আছে, তাদের একজন; এবং নিজের কাছে সে যাই থাকুক কিন্তু যখন সে হাত দুটো পেছনে রেখে মাথাটা টানটান করে বিষাদ বদনে বাজারে কিম্বা বাইরে হাঁটে, আশ-পাশের মানুষ-তো মানুষ, ফরাজিরা যে কেউ হোক তার সামনে পড়লে মুনিম হাত তোলার আগেই তারা সালাম দেয়।

বাতাস শো শো গর্জন তুলে ছুটছে। পথের পাশের তরুণ মেহগনির একটা বিরাট ডাল ছিঁড়ে নিয়ে ক্রোধে মোচড়াতে মোচড়াতে তারা মুনিমের দিকে এগিয়ে আসে। তার শরীর শক্ত হয়ে ওঠে, নিজের অস্তিত্বের অহং নিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে সে ভ্রƒক্ষেপহীন দাঁড়িয়ে থাকে।

গেলো দিন মুনিম কাম শেষ করে লুঙ্গি গোছ-গাছ করছিল; আয়তুন পাটি থেকে উঠে সরাসরি মুনিমের পেটে হাত দিয়ে বললো,—মিয়া সাবের ভুড়িডা খালি মোটা অইতাছে। অহন আর মেয়া-মাগি দ্যায়া কি আইব, তারচে হুত্যায়া হুত্যায়া নাক ডাহাই ভালা। মুনিমের চোখ দপ্ করে জ্বলে ওঠে তবু কঠিন কিছু বলে না। সে লুঙ্গিতে গিঁট দিয়ে, মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে ফিটফাট হতে হতে বলে,—খালি ভুড়িডাই দ্যাখলে…।

নজর-মোটা মানুষকে মুনিম একদম সহ্য করতে পারে না। ছেমড়িডা একটুও বুঝে না, ট্যাহা বাড়লে-তো পেট বাড়বই। মানুষ যে ক্যান এত লেঙ্গুর-মোটা হয়।

মুনিম নিজেই-তো নিজেকে বোঝে না; তা না-হলে ঝকঝকে সকালের আলো ভরা পথে এসে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে প্রায়ই কেন চমকে ওঠে, দেমাগে প্রশ্নটা ঝাঁকি মারে, কীসের তাড়নায় সে এতোটা হন্ত-দন্ত? এক চুমুক উদাস্যের মধ্যেই যখন তার প্রিয় গদি ঘরখানা স্মৃতিতে উঁকি মারে, তখনি তার ঝাঁপসা চোখে-মুখে অজস্র আলোর তীর মুখিয়ে ওঠে। ডানদিকের শিরীষ গাছটা আজ কী পেল্লাই শরীর নিয়েছে, তা-আর মুনিমের চোখ মেলে দেখা হয় না। আজকের এই দাপটি বৃক্ষটা যখন কিশোর ছিলো, যখন মুনিমরা সবাই স্কুলে যাবার পথে এই শিরীষতলায় বাঁক নিতো, তখন লাল হয়ে আসা এক পড়ন্ত বিকেলে সে গোপনে তার ভূগোল বইয়ের পেট থেকে এক ফালি ব্লেড বের করে কচি শিরীষের বাকল কেটে কেটে-বেশ মোটা করে, তার আর রানুর নাম লিখে মাঝে একটা প্লাসচিহ্ন বসিয়ে দিয়েছিলো।

ফরাজি বাড়ির ছোট মেয়ে রানু। টুকটুকে ফর্সা। ছিংলার মতো লকলকে শরীর। বুকে বই চেপে যখন সে স্কুলের পথে হাঁটে, তখন চারপাশের সবকিছুই যেন তার সাথে মন্ত্র-মুগ্ধের মতো হাঁটতে চায়।

পরের দিন মুনিমের বাবা একটু আগধাবারে দোকানের ঝাঁপ ফেলে বাড়ি ফিরে। মুনিম তখন এশিয়ার মানচিত্র আঁকতে গিয়ে খালি রানুর মুখ দেখছে। ইন্দ্রিয়ঘন এই নিবিড় মুহূর্তটিতেই তার বাবা এসে মুনিমের পড়ার টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। অপমানে বাবার মুখটা আংরা হয়ে গেছে। মাথার চুল পটপট করে উঠলে মুনিম দেখলো রানু নেই, তার বাবা তাকে চুলে ধরে শূন্যে তোলে, মাটিতে আছাড় মেরে ফেলে দিয়েছে,-কুত্তার বাচ্চা, কত বড় হিম্মত তর, ফরাজিগর একটা লুম্বার সামান অইছস?

পরের জ্যৈষ্ঠে রানুকে দেখা গেলো তাদের বাড়ির পিছনের পাট ক্ষেতে, মুনিমের গলা জড়িয়ে ধরে ঘামছে। ফরাজিদের ছোট মেয়ের টুকটুকে ফর্সা হাত, পাটক্ষেতের মশার কামড়ে লাল চাকায় ভরে যায় তবু মুনিমের গলা ছাড়ে না।

তার পরের জ্যৈষ্ঠ মাসে, মুনিম ইন্টারের ফরম ফিলাপের টাকা কলেজের কেরানিকে না-দিয়ে, ছাগলের পাইকারকে চড়া সুদে দিয়ে দেয়। আর কলেজ নয়, লোকজন দেখে, বিকাল হলে মুনিম স্টেশনের পাশের টং দোকানে বসে বসে পা দোলায়; সদর ফেরত ট্রেনের ঘণ্টা বাজলে ছেলেটার চোখ-মুখ এক আশ্চর্য উত্তেজনায় লাল হয়ে ওঠে। সেদিন থেকে পাইকারের প্রতিটা চালানের পর মুনিম শিরীষের কাঁচা বাকলে নয়, তার নিজের হৃৎপিণ্ডে একটা একটা করে প্লাস লেখে।

আজ ব্যাংকের সাহেবরা মুনিমের নামের পাশে কত যে প্লাস লেখে, কিম্বা তার আড়তের রোগা কেরানিটি সারা দিন অজস্র সংখ্যার পাশে শুধু প্লাসই লেখে। মাঝে মাঝে সেইসব লম্বা লম্বা সংখ্যাগুলোর শরীর ভরা প্লাস দেখে, মুনিম একটুও খুশি হয় না।

মুনিম মুখে আশ্চর্য এক গাম্ভীর্যের মুখোশ এঁটে দিনমান ছুটে। অনেক দিন যাবৎ ছুটছে। প্রথম প্রথম মুখোশটা খুব চুলকাতো, খসে যেতে চাইতো, আকছা খসে গেলেও জটপট সে পরে নিতো, কেউ দেখে ফেলার আগেই। এখন মুনিমের মুখের সাথে ওটা বেশ মানিয়ে গেছে; হয়তো আজ মুখোশটাই তার প্রকৃত মুখ হয়ে গেছে। এবং ঘুমের মাঝেও হুঁতোম প্যাঁচার মতো থমথমে তার মুখখানায় এক বিস্ময়কর বিষাদ এঁটে থাকে। যখন সে ঘরে ফিরে গোসলখানায় ঢোকে, রানু হাত ভর্তি সোনার চুড়িতে রোদন তুলে লুঙ্গি-গামছা এগিয়ে দেয়। মাঝে-মধ্যে মুনিম অবাক চোখে সেই গোল-গাল ফর্সা হাতের দিকে চেয়ে থাকে; মনে করতে পারে না সে, এই দুখি হাত দুটো কোথায় দেখেছে, এরা কেন এত আশ্চর্য করুণ আর নিরর্থক।

মাঝে-মধ্যে সকালে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে শুনে, তার মেয়ে পাশের বাড়ির আতাবুরের ছেলেকে ডাকছে,—বড় ভাই, আমার লাইগ্যা একটা রিকসা আটকাইয়ো, বড় দেরি অইয়াগেছে, আউছক্যা স্যারে বকবো। মুনিম কিঞ্চিত চিন্তিত হয়। আতাবুরের ছেলের মুখ মনে করতে চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। বুকের মাঝে কেমন ভার ভার লাগে। নিজের ছেলে নেই। রানু যে কি কল্ল!

…এই বড় ভাইডা ক্যাডা, আল্লাই জানে এই কুত্তার বাচ্চা যে কী করবো? মুনিম একটু নড়েচড়ে বসে। মেয়ের ব্যাপারে আরেকটু সর্তক হওয়া উচিত; এরকম একটা চিন্তা মগজে মুখ তুলতে চায় কিন্তু ভাবনাটা গাঁথুনি নেবার আগেই মধ্য বাজারের জায়গাটায় মার্কেট করার লোভ এসে হুড়মুড় করে তার কাছ থেকে মেয়ের মুখ আড়ালে ফেলে দেয়।

মুনিমের বুকের মাঝে কালো তাগার মতো একটা ক্ষোভ টান টান হয়ে লেগে থাকে। নিজের মেয়েটাকে সে একটুও বুঝে না। মেয়েকে খুশি করার জন্য কিছু একটা বললে উলটো সে রাগ করে। মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে পড়ে, ২০ বছর আগের রানুকে পাটক্ষেতে খোঁজে। না-পেয়ে হয়রান হয়ে নিজের শূন্য বুক হাতড়াতে হাতড়াতে জেগে দেখে সে রানুর মাঝঘরে দাঁড়িয়ে আছে। নীল মশারির ভেতর দুই রানু এক সাথে। কোন রানুকে যে কানে কানে কথাটা বলবে? সে এক মস্ত ফাঁপর! আসল রানুকে ঠাওরাতে ঠাওরাতেই সে মোদ্দা কথাটা ভুলে যায়।

পরশু/তরশু হবে, মুনিম ঘুম থেকে উঠে রানুকে খুঁজতে গিয়ে দেখে, অবাক এক নারী; ছবির মতো টানটান দিঘল শরীর। তার পিঠ ভর্তি ভেজা চুল থেকে আনারের ফুলের মতো টপটপ জল পড়ছে। স্তম্ভিতের মতো মুনিম চেয়ে থাকে। কাকে যেন কোথায় এমন করে একদিন দেখেছিলো…

মুনিমের ভেতরটা কলকল করে ওঠে। অনেকদিন পর তার শরীর-মন খুশিতে নির্ভার লাগে। নারী, ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে ডান দিকের করিডোরে বাঁক লয়। সে তখন তীব্র চোখের এক ঝলক দৃষ্টিতে নিজের মেয়ের মুখটা চিনে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

মুহূর্ত কয়ের এইসব টুকিটাকির মাঝে, আড়ত আর ইট ভাটার জটিল দায় এসে চট করে জামবাক মলমের মতো লেপ্টে বসলে, মুনিম বিস্বাদ বদনে রিকশায় চড়ে।

নগরের গরম গরম খবর নিয়ে, আরো অনেক সাইনবোর্ড লেগেছে শিরীষ গাছটায়। দর্জির দোকান থেকে মোবাইল ফোন, অর্শ-গেজ থেকে কিন্ডারগার্টেন। পাকা সড়কের কালো পিচ, রোদের তেজে খা খা করে। আশপাশের খানা-খন্দ-ভরা বুনো মাঠটায় আজ ইরি চাষের জন্য হু হু করে ট্রাকটর ছুটছে, মাটির গভীর থেকে স্যালোকল আগ্রাসী চুমুক দিয়ে জল টেনে ক্ষেতে এনে উসটে ফেলছে। বস্তা বস্তা ইউরিয়া, টিএসপি সার ঠেলা থেকে ক্ষেতের বাতরে নামছে। সবকিছু কেমন অচেনা আর পরপর লাগে! তবু মুনিম চেয়ে থাকে। এসব চাইতে চাইতে সে রিকশায় বসে ঢোলে, অথবা ঢুলতে ঢুলতে সে রিকশায় ওঠে। আসলে সে এসব কিচ্ছুটি দেখে না। সে দেখে আড়ত, ব্যাংক, ইটের ভাটা, ছাগলের পাইকার।

এতো অবসাদ! ঘাড়ের রগে এতো হিম, জিভ-টাকরায় এতো মর্চে…। মুনিম…মুনিম…করে কে যেনো কয়টা ডাক দিলো। কিন্তু চর্বির আস্তরে ঠাসা মোটা ঘাড়খানা চাইলেও সে সহজে ঘোরাতে পারে না।

বড় রাস্তায় রিকশা দাঁড় করিয়ে গুটি গুটি পায়ে, কয়টা চষা ক্ষেত-বাতর ডিঙিয়ে, আয়তুনের এই ঝুপরির ভেতর সামলে-সুমলে মুনিম ঢুকে কি উপাসির মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা গুতানোর জন্যে? তবে সে কেন আসে তাও খোলাসা করে বোঝে না। আজকাল অবশ্য মুনিম তেমন কিছু বুঝতে মাথা খাটায় না। একটু ভাবলেই গা বমি বমি করে।

সামনের দিকে বিরামহীন ছুটার যে ব্যামো তাকে কাবু করে বসেছে, তা থেকে ক্ষণিক মুক্তির আপাত সহজ উপায় হিসেবে হয়তো সে আয়তুনকেই বেছে নিয়েছে। মুনিমের ফিরতি পথের পাশেই এই টুকটুকি পাখিটি ছন-বন দিয়ে তার বাসাখানা সদ্য তুলেছে। সারাদিন খালি ট্যাহা আর মানু, মানু আর ট্যাহা। মুনিম বিড়বিড় করে। সমস্ত দিনের জটিল লেন-দেনের মতো তার সেই একান্ত সংলাপও জটিলতায় গুমরে ওঠে।

ধান-চাউলের আড়ত থেকে তার ছুটতে হয় অটো রাইছ মিলে, সেখানে থেকে ইটের ভাটায়। মাঝ বাজারে একটা জাগা কেনার জন্য মলামলি চলছে। দামটা একটু চড়া হলেও, মার্কেট করার খোয়াবটা কিন্তু দিনে দিনে মুনিমের বুকে পোক্তই হচ্ছে। কারণ, স্থাপনাভিত্তিক বাণিজ্য না থাকলে ওপরতলায় কলকে মিলে না। তাই ফাঁকমতো সেদিকেও এট্টু চক্কর দিতে হয় দম নেবার জন্য।

সন্ধ্যা নামলে, মুনিম চা-নাস্তার পরে গরু-খাসি আর মুরগির পাইকারদের কাছ থেকে, লগ্নির মাল সুদে-আসলে আদায় করে। টাকা ছাড়া আর কিছুতেই তার রুচি নেই। ইলিশ ভাজা কিম্বা মুরগির রানের চে’ পাইকারের শুকনো মুখ দেখে মুনিমের বেশি আনন্দ। চোখে-মুখে, ঘনায়মান রাতের অন্ধকার লেপ্টে মোকাম ফেরত পাইকাররা যখন তার অপেক্ষায় আড়তে বসে বসে ঝিমায়, তখন সে আমুদে হাই তোলে। এদের মাঝে কেউ কেউ কুড়ি বছর ধরে মুনিমের বিশাল বপুটির রসদ যোগাচ্ছে। সে এমন চালে এদের সাথে লেনদেনটা করে যাতে কেউ-ই আর নিজের তহবিলটা গড়ে তুলতে না পারে। নরখাদক বাঘের মতো সন্ধ্যা হলেই সে পাইকারদের জন্য খাপ পেতে বসে থাকে। তার কাছে এই নেশা বাংলা মদের চে’ উত্তেজক। সেজন্যই এই পুরোনো কারবারটা সে ছাড়ে-ছাড়ে বলেও আর ছাড়তে পারছে না।

এবং, তখন থেকেই সন্ধ্যার আকাশের মতো মুনিমের মেজাজের ওপর অন্ধকার নেমে আসতে শুরু করে। ফুটো টিনের ভেতর দিয়ে বাইরের পৃথিবী যেমন অন্ধকার ঘরে চোরা চোখে চেয়ে থাকে—তেমনি মুনিমের বুকের জটিল গহ্বরে একটি তৃষিত চেতনা আনকা দৃষ্টিতে মাঝে-মাঝে চোখ মেলে মুচড়ে ওঠে। কিন্তু সেই অনুভব কঠিন-কঠিন বিস্তর উপাত্তঠাসা বিষয়ী গহ্বরে তিলেকেই চাপা পড়ে।

রাত দশটার পরে অফিসের ডিপ লকারে হার্ড মাল ঢুকিয়ে, মুনিম বুক পকেটে মাত্র ৫০ টাকার দুটো নোট রেখে রিকশায় ওঠে। এবার পঙ্খিরাজ দুলে-দুলে হাওয়ায় উড়ে।  রাস্তার পাশের গাছ-পালার ভুতুড়ে ছায়ার চিপা-চাপা দিয়ে নক্ষত্রের ক্ষীণ আলো দ্বিধায় নড়েচড়ে। মুনিমের মুখে হুতুম প্যাঁচার গম্ভীর্য। আশ্চর্য এক মুখোশ এঁটে মুনিম ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে জেগে থাকে। সামনে ডাকু মার্কা সারথি পনপন করে রিকশার প্যাডেল মারছে। হু হু করে মাঠের বাতাস তার নাক-মুখ ছুঁয়ে-ছেনে মাথার চুলে বিলি কেটে পিছিয়ে যায়। দরকার মতো এই ছেলেটা প্রাণ দিতে প্রস্তুত। অনুগত ষণ্ডা সারথির জন্য তাই এই নোট, কচি আয়তুন বাকিটা। মুনিমের তৃপ্তি অজস্র সমস্যা ও সম্ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে ঢেকুরের মতো বেরিয়ে আসতে চায়; আসলে মাইনষ্যের দাম কয় ট্যাহা?

এক্ষণ, এই মুহূর্তে সে যদি একটু উপরে কয়টা ফোন লাগায়া চায়-তবে থানা সদরে একটা হুলুস্থূল ফেলে দিতে পারে এবং অবশ্যই সে চাইলে কয় হাজার মাল খরচ করে জিন্দা যে কাউকেই লাশ বানিয়ে চিরদিনের জন্য গুম করে ফেলতে পারে। সে বাম হাত দিয়ে তার নিজের ডান হাতটা চেপে ধরে। কব্জির ঘসঘসে রোঁয়া বাঁ হাতের আঙুলে তুরতুরি দেয়। এক আদিম উত্তেজনায় মুনিম ডান হাতে মুঠি পাকিয়ে নিজের তেজ পরখ করে।

মুনিমের হুঁশ ফিরে। আয়তুনের ঘরের তরল অন্ধকারে বুনো ফলের একটা তেজি ঘ্রাণ তাকে উন্মার্গ করে। মুনিমের চোখ দুটো মুহূর্তে উধাও; সেই শূন্য গর্তে এসে ঠাঁই নেয় কোনো নিশাচরের ধাঁধানো তীব্র চোখ। মাড়ির হাড় ফেটে যেন বেরিয়ে আসে কোনো মাংসাশীর দীর্ঘ-ধারালো কর্তন-দন্ত। সে ইচ্ছে করলেই এই দুবলা কামিনীর আস্ত মস্তকটাই মুখে ফেলে পিষে-চুষে নিতে পারে। কিন্তু সে চোখ বন্ধ করে ঝিম মেরে অপেক্ষা করে। আঁটো চোখের অন্ধকার মণিতেই চিন্তার দ্যুতিটা ঝিলিক দেয়, আসলে পুরুষ মানুষ বিত্তের পাশাপাশি তর্জনি উঠাতেই বেশি পছন্দ করে।

মুনিম একটু একটু করে শুধু ধনার্জনই করেনি; শিখেছে কেমন করে বছরের-পর-বছর শীত-গ্রীষ্মকে তুচ্ছ করে অপেক্ষা করতে হয়, কেমন করে বিষ হজম করে মুখে মধু উগড়াতে হয়; আর কীভাবে একটু একটু করে মানুষকে মুঠির ভেতর ভরে জিন্দা রেখে রস শুষে নিতে হয়।

সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাশ করতে গিয়ে মুনিম প্রায়ই চমকে ওঠে; পান-জর্দার রস মুখের ভেতর সারাটা রাত পচে পচে বুঝি পাইকারদের রক্ত হয়ে গেছে। থুথুর সাথে চাকা চাকা রক্তে সাদা বেসিনের শরীর ভরে ওঠে। মুনিম দিশেহারার মতো কাশতে থাকে। তার হাত-পায়ে খিল ধরে, একটু একটু ঘামের সাথে মাথাটাও ঝিমঝিম করে ঘুরে ওঠে।

সারা শরীরে একটা উৎকট জ্বালা তিরতির করে দখল নেয়। ফুটবলের মতো গোল শরীরের মুনিম, তার হাতের আঙুলগুলোর দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে। জোঁক যেমন রক্ত চুষে-চুষে কালো জামের মতো গোল আর অসার, তেমনি তার আঙুলগুলোও, সারাদিন শুধু যন্ত্রের মতো টাকা গোনে। কিন্তু তার সেই গোদা-গোদা আঙুলের ডগাগুলো হঠাৎ শিরশির করে ওঠে আর তক্ষুণি সে টের পায় তার নখগুলো পশুর নখের মতো তীক্ষè আর দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। তার হাতের ত্বক ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসছে কুচকুচে কালো লম্বা লম্বা রোঁয়া। পলে-পলে তার হাত দুটো শিম্পাঞ্জির হাতের মতো ঘন লোমে ছেয়ে যাচ্ছে।

মল দেখার মতো মুনিম থুতু ফেলে সব কিছু ভুলে যেতে চায়। তার সক্কল ইন্দ্র্রিয়ের উপর একতরফা আধিপত্য সে হারাতে বসেছে। আজ-কাল সে প্রায়ই জংলী ফুলের মতো আয়তুনের গতরের উপর উঠে যেন ঘুমিয়ে পড়ে।

তামাদি সবকিছু উদ্ধারে মতো সে মরিয়া হয়ে হাত বাড়িয়ে আয়তুনের দীর্ঘ আর নরম গ্রীবাটা ছুঁয়ে দেখে, মাগির অসমাপ্ত কামনা ঘাড়ের ধমনীতে তীব্র মাথা মারছে। সে জানে আয়তুনকে আরো লন্ডভন্ড করা উচিত ছিলো। মাড়াই কল দিয়ে চাষা যেমন আখ পিষে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, দরকার কি অনাহক সময় আর শরীর ক্ষয় করে, আয়তুনের তৃপ্তিতে মুনিমের কী ফায়দা।

মুনিম দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই আয়তুনের একটা স্তন খামচে ধরে। অল্প দিন হলো এ লাইনে আসা মেয়েটার শরীরে এখনো একটা খাঁজও পড়েনি। আয়তুন বুকের যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে; তাতে মুনিমের স্নায়ুতে অন্যরকম একটা সুখ শিরশির করে দৌড়ে। মেয়েটার কচি স্তন তার মুঠির লম্বিত চাপে ডিম্বাকৃতি থেকে বেলুনের মতো চ্যাপ্টা-দিঘল হয়ে যাচ্ছে।

আয়তুনের স্তনের উত্তাপ আর আকৃতির রূপান্তর দেখার সময় কই, সে ঠার করে তার হাতটাকে। আশ্চর্য এক আবিষ্কার হচ্ছে এই হাত। মানুষ তার কব্জিকে ইচ্ছে মতো রূপান্তর করতে পারে। মুমূর্ষুর মুখে জল তুলে দিতে পারে, পারে দুর্বলের টুঁটি টিপে স্তব্ধ করতে। সে শিহরিত হতে হতে আন্দাজ করে, ভরা নর্দমার মতো তার ভেতরটাও এক আদিম সুখে গলগল করে উপচে উঠছে।

উলঙ্গ আয়তুনকে দেখার সাধ হলে সে তার বন্ধ চোখ দুটোতে লাইট জ্বালিয়ে নেয়;…আহ…তার লোভাতুর ক্ষীণ কটি, চওড়া-চেটালো পাছা, নাছোড় ভগমানের মতো দেমাগি আর রহস্য ভরা উঁচুমুখী স্তন আর অনন্ত কামনার জ্বালা-ধরা চোখ নিয়ে সে কাৎ হয়ে পড়ে আছে একটা মাঝবয়সি ভাল্লুকের হাতে!

মুনিমের তালু জ্বলছে। সে পালাতে চায়।

উচ্ছিষ্ট নারী, অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে অপেক্ষা করে। একটু বুঝি কেঁদেও নেয়। ঘরের অন্ধকারে আরো অন্ধকার হয়ে মুনিম দাঁড়িয়ে-দাড়িয়ে আয়তুনের বুক দুটো ডলে। বাইরে দরকচা চাঁদটা খানিক উঁকি দিলো, হয়তো সে বাঁশবনের আড়াল দিয়েই জন্মের মতো চলে যাবে।

আয়তুন চাঁদটা দেখার জন্য ছটফট করে।

একটা পঞ্চাশ টাকার লাল নোট ছোটখাটো কালচে ছায়াটার দিকে মুনিম কফের মতো ছুঁড়ে মারে। আহত, অসুখী, দুর্বল প্রাণীটা সহজে ছাড়া পেয়ে আনন্দে কিচিরমিচির করে ওঠে। আর মুনিম ভাবে কত কম পেয়েও মাগিটা খুশিতে মরছে!

কী পেলে সে একটু খুশি হতে পারে, এরকম একটা ভাবনাকে মুনিম টোকা দিয়ে চমকে ওঠে।

বড় রাস্তার দিকে ফিরতে ফিরতে মুনিম, মানুষ নামের ছোট শব্দটার সুদ-আসল গুনতে গুনতে চোখ মুছে আর চারপাশের অন্ধকারকে দুহাতে নিজের বুক পকেটে ভরে মজুদ করে…।

লেখাটি প্রকাশিতহয়

হরমা’ প্রথম বর্ষ  সংখ্যা-১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮

এমদাদ রহমান এর গল্প কালসন্ধ্যা

কালসন্ধ্যা

তেঁতুলতলার একজনের উরুতে চুলকানি আছে, আপনাদের কারো নাই-তো? তবে ঠিক আছে। নিরঞ্জন, ডুগডুগি বাজাও।

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ…

কিন্তু দাদামশায়রা আবার নাচতে শুরু করবেন না যেন। নিরঞ্জন…

ডুগডুগি বাজবে মাত্র পাঁচ মিনিট। তারপর শুরু হবে…নিরঞ্জন…

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ…

ঠিক আছে, এবার তুমি থামো। পাঁচ মিনিট পূর্ণ হয়েছে আর পিনপতন নীরবতা নামছে। এবার আসুন সক্কলে মিলে তাকানো যাক অ-অ-ই দিকে। ঐদিকে মানে কোনদিকে বুঝতে পারছেন না-তো? এই-যেখানটায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি, এখান থেকে অ-অ-অ-ই দিকে তেঁতুলগাছটা দেখতে পাচ্ছেন না দাদামশাইরা? নিরঞ্জন…

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ।

এবার আমাদের একটু একরোখা দৃষ্টিতে তাকাতেই হচ্ছে। তেঁতুলগাছটা পষ্ট হয়েছে তো? তার নিচে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে, তাই না? না না, একজন নয়। কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে। তাই না? ওদের নাম…আচ্ছা, আপনারা সব্বাই খেয়েদেয়ে এসেছেন তো? যাকগে, তেঁতুলতলায় যাদের দেখতে পাচ্ছেন, তাদের নাম নিখিল, অরুণ, সুধীর, পাচু, গোপাল, পরেশ, বিষু ইত্যাদি ইত্যাদি।

ওদের বাপেরা আজীবন ঢোল বাজিয়েছে। বাপের বাপরাও ছিল ঢুলী। অর্থাৎ শব্দকর। পায়ের কাছে পড়ে রইল আজীবন। রা করলো না। শব্দকরের মুখে রা থাকে না। রা থাকে হাতে। হাতের চালে শব্দ কথা কয়। ঢাক্-কুড়-কুড়… তবে, ছেলেরা চালায় রিকশা। মরার আগে বিষুও চালাত। নিখিল চালায়। পরেশ চালায়। গোপেশ চালায় আর হয়েছে কী—পরেশের ছেলেটা যায় ইশকুলে। নিখিলেরটা যাবে। গেদুরটা বৌয়ের পেটে। পরেশের ছেলের হাতে আমার বাংলা বই প্রথম ভাগ আর সে বানান করে পড়ে-ক ল’য় আকার লা কলা…

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ।

দাদামশাইরা, আপনারা খেয়েদেয়ে এসেছেন তো? নিরঞ্জন…

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ।

আসুন, শুরু করি। এর একটা নাম আপনারাই ঠিক করে নিন। আপাতত কিছু না পেলে তেঁতুলতলার থেটার টাইপের কোনো কিছু আপাতত ধরে নিতে অসুবিধা নাই।

নিরঞ্জন…

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ।

ভাইজানেরা, এখন আপনাদের আরেক জায়গায় নিয়ে যাবো। হয়েছে কী, তেঁতুলতলার একজন, বিষু, কয়েকদিন আগে—তাদের বেলায় স্বাভাবিকভাবে যা হয় আর কী—মারা গেছে।

তার বাপ পুলিন ঢুলি মরল শনিবার। পরদিন বৌ কাতরাতে কাতরাতে ছেলের জন্ম দিল। একজোড়া ছেলে হলো বিষুর। পরদিন, সন্ধ্যালাগার আগেই প্রচ- জ্বর কাবু করে ফেলল তাকে। সে জ্বর থাকলো সাতদিন। মঙ্গলবার, সন্ধ্যালাগার আগমুহূর্তে প্রচ- খিঁচুনী, হাসপাতালের বেডে বমির সঙ্গে রক্ত…

বিষু মারা যাবার রাত থেকে এলাকায় শুরু হলো কুকুরের কান্না।

কুকুরের কান্না অশুভ, অমঙ্গল। তাই না ভাইজানেরা? আপনারা কী বলেন?

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ।

রাতবিরেতে কুকুরের কান্না শোনে লোকজন ভাবে দুষ্কালের কথা। মুখে ই বচ্ছর আর ভাত জুটবে না রে। বাজারে দোকানে দোকানে চালের পসরা সাজিয়ে লোকজন বসে থাকবে অথচ কেউ নাগাল পাবে না সেই চালের। হাত দিলেই সাধের চালে টের পাবে আগুন। লোকজন সেই আগুনের দিকে ভীত-সন্ত্রস্ত তাকিয়ে থাকবে। ভয়ের তাপে সেদ্ধ চালের ভাত হবে। ভাতের ফেন চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে নামবে। মুখের কষ বেয়ে সেই ফেন মুখের ভেতর ঢুকে পড়বে। তখন নিজের কান্না খেতে থাকবে মানুষ। কুকুরের কান্না তাই অমঙ্গলের বার্তা।

লোকজন ঘুমের ঘোরে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। কাঁথার ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠে নবজাতক। উরুর গলিপথে ঢুকতে যাওয়া ক্ষুধার্ত লিঙ্গগুলো হঠাৎ নেতিয়ে পড়ে। বয়োবৃদ্ধ নারী বা পুরুষ আসন্ন মৃত্যুকে অবগুণ্ঠনে ঢেকে দিতে চায়—ও আল্লা। ও ভগবান।

ভাইজান এবং দাদামশাইরা, এখানে আরেকটি কথা বলতে ভুলে গেছি। নিরঞ্জন…

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ…হ্যাঁ, বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। কথাটা হচ্ছে রাতবিরেতে কুকুরের কান্না শুনে গব্ববতীর পেটের ভেতরটাতেও কান্নার রোল পড়ে যায়! এমনই এক দুষ্কালের সংকেত এটা কী আর বলবো!

রাতবিরেতে কুকুরের কান্না তাই অশুভ।

আপনাদের জ্ঞাতার্থে পেশ করি, বিষুর মা বোবা। সে সারারাত চিৎকার করে কাঁদে। বোবা মানুষের অ-ধরা ভাষা চিৎকারের রূপ নিলে সেটা রাত-বিরেতে কুকুরের কান্নার মতো শোনায়।

রাতবিরেতে সে হাউমাউ করে কাঁদে। ভাষাহীন বোবা এক মা চিৎকার করে উঠলে লোকজনের কানে তা পৌঁছে কুকুরের কান্না হয়ে। জনপদ এই কান্নায় সন্ত্রস্ত হয়ে বসে থাকে। মানুষের জন্য মাঝরাত তখন মৃত্যু আর মন্বন্তরের। বাংলার দুর্ভিক্ষ আর মন্বন্তরের কথা কেউ ভুলে না দাদামশাইরা। ভোলা যায় না। মন্বন্তর মোদের রক্তের সাথে মিশে আছে গো। এমনই তাজ্জব ব্যাপার।

বাসুর মা’র কান্না শুরু হলে গ্রামদেশের গুটিসুটি মারা কুকুরগুলো খুব সন্তর্পণে জেগে ওঠে। খুব অদ্ভুত লাগছে, তাই না দাদামশাইরা? লাগলেও শুনুন : কুকুরগুলো কান খাড়া

করে বুঝতে চায় কোনো সতর্কতা সংকেত ভূগর্ভের শিলার ভেতর গুঞ্জরিত হচ্ছে কি না। তখন তারা নখ দিয়ে মাটি খামচায়। সামনের পা দুটো লম্বা করে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙে আর জলবায়ুর গন্ধ নেয়। বোবা মানুষের কান্নার মানে ধরতে পারে কী পারে না, সেটা তখন আর বড়ো বিষয় নয়—একযোগে কুকুরগুলো বিষুর মা’র কান্নার সাথে সঙ্গত দেয়। কুকুরের সমবেত চিৎকারে বাসুর মার কান্নাকে আর আলাদাভাবে শনাক্ত করা যায় না। এ কান্নায় তাই মানুষ-কুকুর ভেদ নেই। একাকার। এক সময় বিষুর মা নেতিয়ে পড়ে। বেঁচেবর্তে থাকার ক্লান্তি গো দাদামশাইরা! তার কান্না থেমে যায় বটে, কুকুরের থামে না। মরা বিষুর সহোদর-সহোদরা হয়ে তারা রাতভর বিলাপ করতে থাকে। বন্ধু নিরঞ্জন…

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ…দাদামশাইরা, এখানে একটু থামতে হচ্ছে। বিষুর মা পুত্রশোকে কাঁদতে থাকুক, চলুন আপনাদের নিয়ে যাই সেই তেঁতুলতলার কাছে। কত বচ্ছর বয়েস হবে গাছটার? ঠিক কতো বচ্ছর বয়েস হলে একটা গাছকে বৃক্ষ বলা যায়? এই গাছটার বয়েস শতবচ্ছরের ওপর। আপনারা হয়তো ভাবছেন, এই এতো বচ্ছর ধরে একটা গাছ এখনও টিকে আছে কী করে! দুনিয়া এতো আজব? এতো দিনে তো গাছটা ব্যবহার হয়ে যেতো আসবাবপত্র হিসেবে। হ্যাঁ, তেঁতুলতলায় এখন কিছু ঘটছে বলে মনে হয়। কেউ কেউ সেখানে কথাবার্তা বলছে বলে মনে হয়। নিখিল, যাকে দূর থেকে বেশ লিকলিকে বলেই দেখে নেয়া যাচ্ছে, কী দেখতে পারছেন? চোখ খুলুন। ঘুম পেলে চলবে কেন? কুকুরগুলোর মতো আপনারাও আড়মোড়া ভাঙুন, দৃষ্টিকে একরোখা করুন আর কানকে নিয়ে আসুন সন্তর্পণের এমন এক দরোজায়, পিনপতনের শব্দও যাতে ফস্কে না যায়…

নিখিল অরুণকে বলে—বাসু মরল আসপাতাল, মুই কেমনে মরমু জানস? বিষ খাইয়া। পেট ভরিয়া খাইমু। কি সুখর বাচা রে! থুঃ।

অরুণ তার দাদভর্তি উরু চুলকাতে শুরু করে। খরখরে একটা আওয়াজ পাচ্ছেন তো?

পাঁচ টাকা ছ টাকা দামের কতো কৌটা মলম আপসে খরচ হয়ে গেল, দাদের বিস্তার তবু  কমে না। নখে রক্ত লাগার আগ পর্যন্ত তাই আর নিস্তার নেই। একবার চুলকানো শুরু হলে চোখ বন্ধ করে আঙুল চালাও। নখের ডগায় রক্ত দেখো। তার উপর শালার দেমাগও দেড়গুণ। উরুতে আছিস, ভাল কথা থাক। কিন্তু একজায়গায় থেমে থাকা দাদের ধাতে নেই। সে বিস্তারিত হয়। উরুর ফাঁকে যে একটা মরকুটে লিঙ্গ থাকে মানুষের, একদিন সেটাতেও চাকা চাকা দাদ ফুটতে শুরু করে আর সে কি চুলকানিরে বাপ! এই নিয়ে রাতদিন বৌয়ের অকথ্য গালাগাল! বৌ’টাও চুলকানির হাত থেকে রেহাই পায়নি। সেও সংক্রমিত হয়েছে। দুই উরু লাল লাল চাকায় ভর্তি হয়ে আছে। তাকেও সংসারের জরুরি অনেক কাজ ফেলে উরু চুলকাতে হয়।

: বিষুর মায়ে খালি কান্দে রে। খালি কান্দে আর অইছে কিতা, মানষে কান্দে না কুত্তায় কান্দে তাও বুঝি না। হক্কলতা এক। চিনা যায় না…এ অরুণ! হুনরেনি কিতা কই? নিখিলের কথায় অরুনের কোনো সাড়া নেই।

: কিতা অইছেরে? তরে দেখি ভুতর লাখান লাগের!

: মর জ্বর উটছিল। হারা রাইত জ্বরর ঠেলায় খালি কু কু করছি, বমি করছি চাইর পাচ বার, বিয়ানে দেখি থুরা ভালা লাগের, হেষে মায় কয় বাজারো যা। মার কথায় বার  অইছি—কথাগুলো একটানা বলে অরুণ হাঁপায়। টের পায় পেটের ভেতর খিদার বজ্জাত কামড়। খিদার কামড়ে মাথাটা একটু যেন এদিক-ওদিক দুলছে। খা খা রোদে পুড়তে পুড়তে, জীবনের শেষ আশ্বাসটুকুতেও চোতমাসের আগুনমুখা দিন যেন তার করাল কামড় বসিয়েছে। কথার প্রসঙ্গ পাল্টে খুব দ্রুত—

: পেসিনজারে দশটেকার জেগাত পাচটেকা ভাড়া দেয়।

: পেসিনজার যুদি শুওরর চুদা অয়…

পরের কথা আর বলতে পারে না নিখিল। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এসেছে। ঝাপসা চোখে কতোগুলো মুখ যেন খাবি খেতে শুরু করেছে। ক্ষুব্ধ। বুভুক্ষু। নিখিলের কোনো কিছু কি মনে পড়ে যাচ্ছে? কী বলেন দাদাভাইরা, ভাইজানরা? আপনার কিছু আঁচ করতে পারছেন? নিখিলের বুঝি ঘরের কথা মনে পড়ল!

ঘর! যখন বৃষ্টি-বাদলা হয়, তখর ঘরের ভেতর কাউকে ছাতা মাথায় বসে থাকতে দেখেছেন? নিখিলকে দিতে হয়। অরুণকে দিতে হয়। যামিনী ঢুলির হাড়জিড়জিড়ে মাকে ছাতার তলায় ঢোকাতে হয়। পুলিন ভাঙা পা টেনে টেনে ঢুকে পড়ে চৌকির তলায়। বাইরে বাতাসের মাতম। কিন্তু ভেতরে? সেই একই। যা বাহির, তাই ভেতর। ফারাক নাই। বাইরের আর ভেতরের যোগফল এক। ঐ যেমন রাতবিরেতে বিষুর মায়ের কান্নার সাথে কুকুরের সঙ্গত। মানুষের কান্নাকে আলাদা করে চেনার উপায়ই থাকে না, তেমন আর কী। যেদিন কালো আকাশ জনপদের ওপর ভেঙে পড়ে তুমুল দাপানি তুলে, নিখিল-অরুণ-সুধীর-পাচু-গোপাল-পরেশ ঢুলিপাড়ার সক্কলে তখন ঘরের কথা ভুলে যায়। ঘর দুলতে থাকে, ভাঙতে থাকে, পড়তে থাকে…

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ।

আচ্ছা, কাহিনী এখন একটু বন্ধ থাকুক। ভাইজানদের সাথে ইট্টু কথা বলি। ভাবনা চিন্তা শেয়ার করি। দাদামশাইরা, এক জাগায় পড়েছি যে, মরণ আর ঘুম পরস্পর যমজ ভাই। কথাটাকে বিশ্বাসও করে ফেলেছি। আপনারা এ ব্যাপারে কিছু বলবেন? কিছু কি বলার আছে আপনাদের? নিরঞ্জন…

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ।

…আরেক জাগায় পড়েছি, মানুষের জীবন নাকি সূর্যের মতো। সূর্যের কী তেজ, তাই না ভাইজানেরা? কত্তো শক্তি। কিন্তু সন্ধ্যা হলেই ব্যাটা একবারে শ্যাষ। মরা। সারারাত তার আর পাত্তা নাই… ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ।

লিকলিকে নিখিল খ্যাপের আশায় তেঁতুলতলা আপাতত ছেড়েছে আর দেখুন ভাইজানরা, অরুণ পেচ্ছাব করছে। সরসর, সরসর শব্দের পেচ্ছাব। তেঁতুলগাছটার ডালপাতার দঙ্গলে পেচ্ছাবের সরসর শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে শিরশির শব্দলহরী ঢেউ ভাঙে। তার চোখ ঝাপসা। ছানিপড়ার মতো। সেখানে একটা ঝাপসা লাশ। হাওয়ার মৃদু ধাক্কায় বাড়ির পাশের ধানক্ষেত দুলছে আর ধানক্ষেতের ভেতর মালতির লাশ। আধন্যাংটো…জমাট বাঁধা রক্তের কালচে ধারা। লাশটার স্তব্ধ চোখের কোণায় জীবনের নুন না কান্না লেগে আছে, অরুণ তা ধরতে পারে না; পারে কেবল ভেতরে ভেতরে চিৎকারে ফেটে যেতে-তরে খুন করমুরে খানকিচুদরা শুওর। মর বেবুঝ বইন্রে তুই…কিন্তু লাশের কানে অরুনের আক্রোশ আর পৌঁছোয় না। আধন্যাংটো লাশটা মনের ধানক্ষেতের দোলখাওয়া দেখতে থাকে। যে ধানক্ষেত জীবনভর মানুষকে খাওয়ায়, সেটা কীভাবে শশ্মানে পরিণত হল, অরুণ সেটা বুঝে না…

রাতের আন্ধারকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না কোনোভাবে। রাত্রে সূর্যটা মরা। তখন, বাপের ফালাফালা বুকের নদীনালাখালে রক্ত উপচে ওঠে। লাল রক্ত। টকটকে লাল। যক্ষা। মায়ের বিলাপ বুক ঝাঁজরা করে দেয়। বোনগুলোও মায়ের সাথে সহবিলাপে মাতে। দিঘল আন্ধার রাতটাকে একটা বিষধর সাপ যেন প্যাঁচ মেরে ধরে আছে!

অ দা, অ অরুণদা…পাচুর ডাকে তার ঘোর ভাঙে আর সাথে সাথে মা-বোনের বিলাপ বন্ধ হয়ে যায়। নুনু বেয়ে অবশিষ্ট পেচ্ছাব দ্রুত বেগে নামতে থাকে। এতোক্ষণ সে নুনু ধরে দাঁড়িয়েই ছিল। নুনু পেচ্ছাব করছিল না। লাশ দেখছিল। পাচুর আচমকা ডাকে ঘোর ভাঙে। বোনের লাশটা উধাও হয়ে যায়। পাঁজরের ভেতর জীবনটা ফের ধুকপুক করে।

পাচু বিড়ি ধরিয়েছিল। আধ-খাওয়া বিড়ি সে অরুনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে অ দা, মুই অখন যাই, পেটোত অখনও কুন্তা পড়ছেনা। ঘরো গিয়া দুইটা দানা মুখো দেওয়া লাগে। তিশটেকার টিব একটা মারলাম। আর একটা মারতে পারলে থুরা চাউল…নিরঞ্জন?

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ…

দাদাভাইরা, এক জায়গায় পড়েছি যে জীবনটা হলো গিয়ে সাপ, সেই জীবনটা যেন এখনই ফণা তুলে দাঁড়াবে এমন গলায় পাচু বললো-পেটোত বড় ভুখ গো দাদা।

অরুণ বিড়িতে টান দিয়ে বলে-তুই অখন ঘরত যা। হিনানপানি করিয়া ঘুম দে, হাইঞ্জার সময় আইছ।

ভাইজানরা তেঁতুলতলার থেটারে আবার লিকলিকে লোকটা প্রবেশ করেছে। আরে মশাই, নিখিলকে ভুলে গেলেন! আর আপনাদের বলে রাখি দাদামশাইরা, এখন আমাদের একটু সরে দাঁড়াতে হবে। চলুন, ঐ টং দোকানের পাশে গিয়ে গোল হয়ে দাঁড়াই। আমাদের এখনও কিছু বলা বাকী রয়ে গেছে। তাছাড়া, ইস্টিশনের ব্যস্ততা এখন খানিকটা বেড়ে যাবে। ট্রেন আসছে। লোকাল ট্রেনটা মাত্র পাঁচ মিনিট থামবে। তারপর ঝামেলা মিটে যাবে। তারপর না হয় আবার আগের জাগায় ফিরে যাওয়া যাবে। তাহলে চলুন, ফের তেঁতুলতলার দিকে তাকান যাক। পেচ্ছাব সেরে অরুণ তার রিকশার সিটে গিয়ে বসেছে। তার উরুর দাদ চড়চড় করছে। আঙুলগুলো খাবি খাচ্ছে চুলকানোর জন্য। নিখিল অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে—

‘অই হালা, দিনরাইত খালি ঝিম মারি পড়ি থাকলে অইবনি? টেইন আইবার টাইম অইগেছে। কপালো থাকলে ভাড়া পাইমু।

অরুণ কিন্তু অনড়। নড়াচড়া নেই। ভাবান্তর নেই। নিখিলের কথা তার কানে ঢুকে না। রিকশার সিটে কাত হয়ে থাকে। তার চোখের ডহরে চিমসানো, খিটখিটে, সিকনিলাগা একেকটা মুখ। তাদের ঘিরে এখন জটিল হিসাবনিকাশ। মরাবাঁচার লেদদেন। সেও মরে যাচ্ছে। সে রিকশার সিটে টানটান হয়ে থাকে। লুঙ্গি কোমরের কাছে টেনে তুলে দাদ চুলকায়। পচা মাংসের গন্ধে তার নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসে।

নিখিল আর কী করে—রিকশার সিটের তলায় রাখা গামছা বের করে চোখ-মুখের ঘাম মুছে আকবর হোটেলের পিচ্চির উদ্দেশ্যে বুকের জ্বালা-যন্ত্রণার কামড়াকামড়ি উগরে দেয় ‘দুই সিঙ্গুল চা দিতে তর কতদিন লাগবরে চেয়ারম্যান? কুন সময় কইছলাম মনো আছেনি? লগে দু’খান বিস্কুট আর এক গল্লাস জল দিস।’ হোটেলের পিচ্চিটাকে তারা চেয়ারম্যান বলে ডাকে। এ হলো রিকশাজীবীর ঘামশেষের মউজ। পিচ্চি চেয়ারম্যান কোমর দুলিয়ে চা নিয়ে আসবে নিখিলের আদেশে! পিচ্চি চেয়ারম্যান গান গাইবে—রসের ফুল ফুইটাছে গো প্রেমের বাগানে…

নিখিলের চেঁচিয়ে বলা কথাগুলো আকবর হোটেলের চেয়ারম্যানের কানে পৌঁছবার আগেই তেঁতুলগাছের ঘনঘোট জটিলতায় ভারি ও প্রলম্বিত শব্দ ওঠে ‘ভোঁ-ও-ও-ও-ও’। আখাউরাগামী লোকাল কুশিয়ারা এক্সপ্রেস হাতপাচোখকানমুখনাক মাল আর মানুষে বোঝাই হয়ে শমসেরনগর ইস্টিশনে ঢুকে পড়ে। ইঞ্জিনের ফোঁসফোঁসানিতে তৎপর হয়ে নিখিল অরুণের উদ্দেশে বাঁজখাই গলায় চেঁচায়—‘টেইন আইছেরে, পুটকিমারা থইয়া অখন রুজিত চল। দিনরাইত খালি ঝিম মারি থাকলে বাল রুজি করবায়। হালা তর কপালো বহুত দুখ আছে কইলাম।’

অরুণ নড়ে না। তার চোখের ডহরে কতো কতো মুখ। এতো মুখের ভিড় ছাপিয়ে নিখিলের কথাগুলো তার কানে ঠাঁই-ই পায় না।

মুই গেলামরে…নিখিল চলে গেলে নিঃসঙ্গ তেঁতুলগাছটা তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমায়। অরুণের টুঁটি চেপে ধরতে চায়। গাছতলার ঝিমধরা বুনোগন্ধের ভেতর নিঃসঙ্গতা যেন উথালপাথাল ঢেউ খেলছে আর কতো কতো মুখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। বিষুর মায়ের মুখ। মরা বিষুর মুখ। দিনেশের মুখ। যার বিয়া ঠিক হয়েছিল। বাজারসদাই করার পরদিন সক্কলের ঘুম ভাঙলেও দিনেশের ঘুম ভাঙেনি। বাপের যক্ষা। মায়ের পেটে আলসারের কামড়াকামড়ি। বিধবা পাগল বোন অর্চনা রাণি। একসাথে দুটি ভাই জলে ডুবে মরে গেল। চৌধুরী বাড়ির দিঘির জলে দুই ভাই একসঙ্গে ভেসে উঠলো। খুব লিকলিকে ছিল ভাই দুটি। খেয়ে না খেয়ে লিকলিকে হয়েছিল খুব। দিঘির জলে দুই ভাই একসঙ্গে ভেসে ওঠে যেন দিঘির জলে পদ্ম ফুটেছে। আরেক বোন মালতী মরলো ফাঁস লেগে। তার পেট হয়েছিল। নারী সবকিছু লুকোতে পারে, কিন্তু গব্ব লুকোবে কোথায়? চোখ তাই দেখে ফেলে। কানাকানি। ফিসফিস। একদিন মালতি লাশ হয়ে ধানক্ষেতের দোল খাওয়া দেখে। চোখ তার পলকহীন।

…আর দাদামশাইরা, রাতদিনের মুখর মরণকূপে দানবের হুল্লোড় তুলে যায় শেষ রাতের ট্রেন, তখন পাঁজরে মুখ-লুকিয়ে-থাকা প্রাণের ভেতর কী তুমুল হিসহিসানি যে জাগে! রাতভর যক্ষায় ক্ষয়ে যাওয়া বাপের লগে যমের একরোখা টানাটানি চলে আর আর উঠানে শিরীষগাছের ডালপাতার ভেতর থেকে মৃত্যুপাখির হিম ডাক সামাল দিতে না পেরে মায়ের গলা অসহায় রোদন করে চলে ‘যমে তর বাপরে আইজ নিলরে…

খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো এই মিনতি রাইতের স্তব্ধতায় ভগবানের পায়ের কাছে মাথাকুটে মরে। অসহায় পাখি ঝড়ের তোড়ে কোথা থেকে কোথায় উড়ে চলে যায়। পেছনে পড়ে থাকে অবুঝ শাবক। মরে যায়। কী মা, কী ছানা কেউ-ই বাঁচে না। অন্ধকারের ঝুলকালি লেপ্টানো রাত তখন নুনতা জলে থৈ থৈ।

বাপের শ্বাসটানার হাঁসফাঁস তাকে দুমড়ায়, মুচড়ায়। মায়ের বিলাপ মৃত্যুপাখির হু হু ডাকের সমান্তরালে মিশে যায় যেন একই দুঃখে পুরো পৃথিবী কাঁদছে। নিরঞ্জন, ডুগডুগি বাজাও।

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ…পাচু চলে যেতেই ফের ঝাপসা চোখে মুখগুলো ভিড় জমায়। খুনে দৃষ্টি মেলে মুখগুলো অরুণের দিকে তাকিয়ে থাকে। বুড়া বাপ, বাপের বয়স্ক ফুসফুসের অন্তিম প্রতিশোধ নিতে বুক-ফাটানো কাশি আর কান্না আর রক্ত আর মায়ের বিলাপ উন্মাতাল রোষে ফিরে ফিরে আসতে থাকে। মালতিকে বুকে নিয়ে ধানক্ষেত শশ্মান…হয়তো পৃথিবীর কোথাও ঝড় ওঠে। একটা দূরগামী ট্রেন অনেক লোকজন আর তাদের অনেক অনেক আশাস্বপ্নকল্পনার দোলাচল নিয়ে ইস্টিশনের বুক ফুটো করে দিয়ে দ্রুত চলে যায়।

বন্ধক রাখা ভিটেমাটির ওপর কোনোমতে টিকে থাকা সংসারে নিত্যদিন তার বাপ যক্ষায় আর মা পেটের ব্যাথায় কাতরাচ্ছে…প্যাডেলে চাপ দিয়ে ইস্টিশনের গেট পেরিয়ে, বাজারের মিটমিটে আলোটুকু পেরিয়ে এছাড়া আর কোথায় যাওয়া যায়? তাই প্যাসেঞ্জার নিয়ে বা না নিয়ে প্যাডেলে পায়ের শক্ত চাপ আজীবন…উরুর চুলকানি খুব বেড়ে যায়। এক সামান্য রিকশাওয়ালা সে। সামান্য। এই জটিল মহারণ্যের কিছুই সে বোঝে না। ভাইজানেরা, আমরা কতোভাবে যে জীবনটাকে যাপন করি। গাদাগাদি বাসের ভেতর সিটের আরামে বসে বাইরের দৃশ্যের দিকে অনিমেষ তাকিয়ে থাকি। বাইরের দৃশ্য তখন খুব মনোরম লাগে। খুব কি মনোরম দাদামশাইরা? হাইওয়ে দিয়ে যেতে যেতে দেখা যায় শহরের এক্কেবারে বুকের ওপর দাঁড়ানো কারখানাগুলির চিমনি দিয়ে গলগলিয়ে মিশকালো ধোঁয়া বেরুচ্ছে, যেন এই চিমনি চাঁদের দিকে পরম মমতায় চুম্বন ছুঁড়ে মারছে। ফ্লাইং কিস। অথচ, বুড়ি চাঁদ শুনতে পাচ্ছে বুকের ধুক্পুক। যাকগে, আমরা ফের তেঁতুলতলার থেটারে ফিরা আসি। নিরঞ্জন, বাজাও।

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ…বিষুর মায়ের কান্না থামে না। উঠোনে উপুড় হয়ে পড়ে সে কাঁদে। বোবা মানুষের কান্নার সাথে সঙ্গত দেয় এলাকার কুকুরগুলো। রাতবিরেতে কুকুরের কান্না শুনে লোকজন ভাবে দুষ্কালের কথা। মুখে ই বচ্ছর আর ভাত জুটবে না রে। ভাইজানরা, শুধু এই বাজারেই নয় বিশ্ববাজারেই চালের দাম নাকি খুব চড়েছে। কী জানি হয়তো বিশ্ববাজারেও এতোদিনে বিষুর মায়ের কান্না কুকুরের কান্না হয়ে পৌঁছে গেছে।

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ…

শহরের কুকুরগুলোর কথা একটু আলাদা। সারাদিন ডাস্টবিনে একটু উচ্ছিষ্ট পায় না তারা। এমনই দুষ্কাল। না পেয়ে ভয় পায়। প্রাণ যাবার ভয়। তখন অতি সন্তর্পণ হয়ে যায় তাদের চলাচল। তারা রা করে না। তারা এমনভাবে দলবেঁধে দৌড়ায় যেন সেনাবাহিনী কুচকাওয়াজ করছে : লেফটরাইট লেফটরাইট।

এমন কেন হয়? বন্ধু নিরঞ্জন? তুমি কি কিছুই বলবে না? শুধু কি বাজিয়েই যাবে আজীবন?

সাইরেন শুনছো? শুনতে পাচ্ছেন দাদাভাইরা? না। এটা এ্যাম্বুলেন্সের শব্দ নয়। মরণাপন্ন রোগীকে অক্সিজেন দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। এই সাইরেন রাষ্ট্রীয়। পুলিশের গাড়ি আসছে। র‌্যাবের গাড়ি আসছে। রাইফেল তাক করে সেনাবাহিনীর শকট আসছে। সবার হাতেই অস্ত্র ভাইজানরা। অস্ত্রে সজ্জিত রাষ্ট্রীয় লোকজন। আসুন, স্যালুটের কায়দায় লাইন ধরে দাঁড়াই। কেউ যেন আমাদের সন্দেহ না করে যে আমরা কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত। আসুন, কুচকাওয়াজ করি। এক-আধটু প্র্যাকটিস থাকা ভালো। একবিংশ শতাব্দীর মানুষ অথচ পা শক্ত করে ঠিকমতো স্যালুট দিতে পারো না, লেফরাইট করতে জানো না তা কী করে হয়? দেখুন দেখুন, সাইরেন শুনে কতো মজার ঘটনা ঘটছে। চালের দাম, মাছের দাম, চিনির দাম, কাপড়ের দাম, সারের বস্তার দাম, কেরোসিনের দাম নেমে যাচ্ছে। শুধু সাইরেন শুনে অল্প সময়ের জন্য একসাথে এতো পণ্যের দাম নামার ঘটনা এদেশে খুব বিরল। দেখুন দেখুন…কী চমৎকার দেখা গেলো…

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ…

নিখিল দু কেজি চাল কিনে ফেলে। সাইরেন আসায় দু কেজিতে চারটাকা বেঁচে গেছে। ভগোমান, যদি আরেকটু দয়া করতে, তাহলে সে আরো দু কেজি চাল কিনতে পারতো…ভাইজানরা, বিষুর মায়ের কান্না কি তবে থেমে গেলো? তবে, সব্বাইকে আশ্চর্য করলো একটা কুকুর। একটা উদভ্রান্ত কুকুর। সে ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে একটা দোকানে ঢুকে পড়ে। খপ্ করে বস্তায় মুখ ডুবিয়ে একমুখ চাল নিয়েই ভোঁ!

…নিখিল রিকশার প্যাডেলে আরো জোরে চাপ লাগায়। তাকে আজ খুব দ্রুত ছুটতে হবে। দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। সিটের তলায় মাত্র দু কেজি চাল। তার চার কেজি না হলে দিন চলে না। মুখের সারি গুমগুম করছে : আরো ভাত দে…ছাবালের মুখে আর কোনো রা নেই আর পচা দেখে ইট্টু মাছ কিনতে হবে। পচা হোক, পাতে এট্টু আঁশটে গন্ধ তো পাওয়া যাবে…সাইরেন এলে সন্তর্পণ হয়ে যায় কুকুরের চলাচল। তারা রা করে না। ঘেউঘেউ ভুলে যায়। হয়তো নিজেকে তখন তারা আর কুকুর ভাবতে পারে না। জন্মের মহত্ত্বের কথা ভুলে যায় তারা। দিন কিন্তুক থেমে থাকে না ভাইজানরা। বিষু মারা যাবার আগে একজোড়া ছেলে জন্ম দিয়েছিল, মনে আছে? তাদের বয়েস এখন তিনমাস। মায়ের দুই কাঁখে বসে তারা হাসছে। তাদের মুখে দুধের গন্ধ। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তারা এখন হাসতে পারে। বেশিদিন বাকি নাই, তারাও বানান করে পড়তে পারবে—ক ল’য় আকার লা কলা…কাঁচকলা, কাঁচকলা। বন্ধু নিরঞ্জন?

ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ-ডুগ।

দাদামশাইরা, থেটারের কুশিলব ফিরে এসেছে। মানে নিখিল এখন চালের ব্যাগ রিকশার সিটের তলায় ঢুকিয়ে রাখছে। তার আর দু কেজি চাল লাগবে। সংসারে ছয়টা মুখ। এদিকে অরুণ দুহাতের আঙুলে খড়কড়িয়ে খুঁড়ে চলেছে উরুর দাদ। নখের মুখে পচা মাংস উঠে আসছে। দুর্গন্ধে ভরে যাচ্ছে পৃথিবী। খামচে খামচে উরুর মাংস খুবলে আনছে অরুণ। রিকশার সিটের তলার একমুঠো চালও জমেনি, তার বদলে উরুর মাংস খুবলে খুবলে…তার দৃষ্টি ফের ঝাপসা হয়ে যায়, তখন একটা আধন্যাংটো লাশ বাতাসের ধাক্কায় ডাইনে বায়ে দুলে…তার বোন মালতির মৃতদেহ।

রিকশার পা-দানিতে রক্ত আর খুবলে আনা পচা মাংস। অরুণ ক্ষিপ্র হাতে উরু খুঁড়ছে।

জড়ানো গলায় অরুণ নিখিলকে ডাকে। নিখিল সাড়া দেয়।

: মালতির কথা তোর মনো অয়নি?

নিখিল থুম মেরে যায়। কারখানার চিমনি মিশকালো ধোঁয়া চাঁদের দিকে ছুঁড়ে মারে।

: মালতিরে তোর মনো আছেনিরে…কারখানার চিমনি মিশকালো ধোঁয়া চাঁদের দিকে ছুঁড়ে মারছে।

: মালতিরে তোর… কারখানার চিমনি মিশকালো ধোঁয়া চাঁদের দিকে ছুঁড়ে মারছে।

ভাষাহীন এক নৈঃশব্দ্যের জগতে ঢুকে পড়ে নিখিল। অরুণ তাকে আজ এ কোন বিপদের মুখে ঠেলে দিতে চাইছে। দুনিয়ার তাবৎ কারখানার চিমনি মিশকালো ধোঁয়া চাঁদের দিকে ছুঁড়ে দিতে চাইছে। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। চাঁদের বুড়ি মিশকালো ধোঁয়ায় হঠাৎ অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিখিলের অসাড় শরীর মাটিতে ধসে পড়ে। একেবারে অরুণের পায়ের কাছে তার মুখ। সে ভাঙাচোরা গলায় বলতে থাকে—মালতিরে মুই মারছিরে অরুণ। আমার মালতিরে…কারখানার চিমনি মিশকালো ধোঁয়া চাঁদের দিকে ছুঁড়ে দিতে থাকে! অরুণ দু হাতের খামচায় উরুর মাংস খুবলাতে থাকে।

কারখানার চিমনি মিশকালো ধোঁয়া চাঁদের দিকে ছুঁড়ে মারে। মিশকালো ধোঁয়ার আন্ধারে খুব সন্তর্পণে অরুণের কাছে উপস্থিত হয় মালতি। দাদা…ও দাদা। ছোট্টবেলায় লুকোচুরি খেলার সঙ্গীর মতো অরুণ বোনের হাত ধরে টানে। মালতি কাঁদছে। মাথায় খুব রুক্ষ এলোমেলো চুল।

অরুণের উরু বেয়ে রক্ত পড়ছে।

শতাব্দী-পুরান তেঁতুলগাছটার দস্যুর মতো ডালপাতার বুনো গন্ধ চুঁয়ে বহু মানুষের ফিসফিসানি আর আক্রোশ ছাপচিত্রে ঝুলে আছে গো দাদামশাইরা আর কারখানার আকাশমুখী চিমনিগুলো মিশকালো ধোঁয়া ছুঁড়ে দিচ্ছে চাঁদের বুড়ির দিকে।

নিরঞ্জন, কোথায় তুমি?…

লেখাটি প্রকাশিত হয়

হরমা’ প্রথম বর্ষ  সংখ্যা-১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮

ইউসুফ বান্না’র তিনটি কবিতা

স্বত্বনাম

আমি কি তোর থেকে প্রাণ নিচ্ছি মা

নাকি তুই ফিরিয়ে দিচ্ছিস আমাকে

আনমনা—

জীবনের রূপকথারা যেখানে ফেরারি

মেঘের গল্পে

ছিন্ন বকের ভাষায় উড়ার কল্পনা—

অনেক দিনের হাজার বছর আমার বিগত প্রভাতি।

তোর কবিতায় তবে এতো বাস্তব কেন বাস্তবতা

মাটির অনেক রং—রূপগ্রস্ত শশীর পাত্রে নিশির আলো

আমি উপুড় করে ঢেলে দিলে

তুই-ই তো জোসনার আত্মাও আত্মজা।

কারো কান্নার শব্দে চমকে উঠি—এমন আমি

স্বরের শেকড়ে যখন ধমনিতে ধাই

নিঃশ্বাসের এতো কাছাকাছি কে এই মানব বসে থাকে?

বিশ্বাস করবি না তুই এই প্রথম আমি

রক্তকে দেখাইনি ফিনকির ফাঁদ

শব্দকে যাতনার উপশম দিয়ে

গোধূলিকে থামিয়ে দিয়েছি অস্তরাগে

মাটির পুতুল আমার চোখ মেলে চাইলেই

আমি অঞ্জলিতে আলো ভরে নিই

সাতটা সপ্তকে সুর গেঁথে যায় রংধনুতে।

বহুদূর থেকে মগ্নতার দিকে ফেরার পথ আছে

তুই হাঁটলে আমি পাশাপাশি—

না হয় মগ্নতাতেই থাকি—তুই দিলে মা

চিনে রাখ আমার ঠিকানা।

নির্ভানা

ভূমিকার বদলে একটা প্রশ্ন রেখে দেয়া যায়

উনমনা কিছু বাক্যের তাগিদের চেয়ে

অসমাধানের ব্যাপিত সংযমের মাঝে

সাধনার তিলক এঁকে যোগাসনে বুদ্ধের সঞ্জীবনী

বোধের যুদ্ধে স্থির ভাস্কর্য যেন ভাস্করও

চোখ খুলবে মোক্ষ সময়ের দিব্যতায়

হয়তো স্পষ্ট পার্থিবে—

আমি জানি না বলেও চলে যেতে পারি

জানার সত্যে ঘোর— ঘুরতে ঘুরতে

চিরন্তনের বিষণ্ণ গ্রহ—

পৃথিবীটা নাটাইয়ের মাঞ্জা সুতোর শেষে

মহাজাগতিক ঘুড়ি রহস্যে খোলাবাক্যে ভোকাট্টা

হে জীবনী আমার প্রেরণা হবে কি তুমি?

আপাতত আমি প্রশ্নমালা থেকে প্রশ্ন নিয়ে যাচ্ছি

গুপ্তধনের কিংবদন্তি রচনার মৃত্যুগন্ধী কৌতুহলে

মানবের সমীরণ মানবতা এবং সমীকরণের ধাঁধায়

উত্তরের ঠিকানায় শুধু একটি নকশা পৌঁছে যাবে।

সুপ্তি

আলো কণ্ঠ খুঁড়ে পাপের পানীয় ঢেলে দিয়েছি জ্বলন্ত

সইল না তোর জলবৎ তরলং এ সত্য সহজ

আলোর বিবমিষায় উগড়ানো অন্ধকার

নিকষ ক্লেদের পথে নিদারুণ একা

হেঁটে যেতে যেতে শিষ দিতে পারি—গেয়ে উঠি চটুলতা

কেউ দেখবে না—ছোট হতে হতে অনু হয়ে পৌঁছাবো আলো

বীক্ষণেও বুঝবে না কার এই স্বত্ত্ব সাকার

আমি নিজের ছায়ার চেয়েও ছোট হয়ে আছি

তবে ভুল হল আলো-মাতাল বুঝি অন্ধকার?

তুচ্ছতম সর্বনামে ডাক দিলে বিশেষণে জেগে উঠি

সূক্ষ্ম সুপ্তির ভেতর খুব কষ্টের কাছে অন্ধ হয়েছি স্বপ্ন

আর কত বলো আর কত আর…

হননের কাছাকাছি থাকি শমন সঙ্গিনী

হতে পারে; জীবন-তো বহুবিধ অশনি সঙ্গম

চোখ আছে বলে দেখার যাতনা বুঝি

.

তবু বলে রাখি কোনক্রমেই আমার

অনুতাপ হয় না কখনো—

লেখাগুলো প্রকাশিত হয়

হরমা’ প্রথম বর্ষ  সংখ্যা-১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮

অদিতি ফাল্গুনী এর দুইটি কবিতা

খরোষ্ঠি লিপির কবিতা

একটি পুরোনো খামে,

তোমার সকল চিঠি,

ক্ষীয়মান খরোষ্ঠি লিপি…

যে পাখি হারিয়ে যায়,

হারায় যে মানুষ…

ব-দ্বীপ ছেড়ে,

ভিন্ন কোন অনামী ডেল্টায়…

শীতে ফের অভিবাসী পাখি আসে,

বরফের দেশ ছেড়ে উষ্ণমগুলে—

আবারো চলে যায়…

একটি পুরোনো খামে,

তোমার সকল চিঠি,

ক্ষীয়মান খরোষ্ঠি লিপি…

জীবনের সমূহ ঝড়,

আমাকে দেবে আয়ু,

শেকড় সমর্থ করে…

লোকে বলে ‘স্যান মেরিনো!’

অথবা সে সেন্ট মার্টিনস্!

আমি বোতলে ভরবো চিঠি,

ভাসাবো সে বোতল,

প্রবাল দ্বীপের জলে,

তুমি কুড়িয়ে নিও,

যদি মেলে অবসর…

অনামা সে রৌদ্র নদীকূলে!

ফেরা না ফেরা

আসলে ফেরে না কেউ,

যারা ভাবে নতুন মানুষীর কাছ হতে ফিরেছে পুরোনো প্রেমে,

আসলে ফেরে নি তারা,

ফেরে নি কোথাও—

কোন মৌসুমি বায়ুর উপকূলে!

তেমতো যেসকল নারী,

ভেবেছে ফিরেছে তারা পুরোনো পুরুষের কাছে,

তারাও ফেরেনি কোথাও,

ফিরতে পারে নি…

এ সত্য বুঝেছিলো সেই মেয়ে…

যার কাছে আসতে আসতে,

ফেরার কথা ভেবে—

বিনষ্ট জতুগৃহে ফিরে গেছে কিছু অসুখী পুরুষ।

ফিরেও হয়নি সুখী—

আর, তার কাছে ফিরবে বলে

নতুন মানবী ছেড়ে আবার যে পুরুষেরা ফিরে আসে

ভীষণ একাকী হয়েও পুরোনো তাদের ফেরা ফেরালো সে,

যেহেতু জানতো সে ফেরে না কেউ,

ফিরতে পারে না…

কোনো মৌসুমি বায়ুর উপকূলে ।

লেখাগুলো প্রকাশিত হয়

হরমা’ প্রথম বর্ষ  সংখ্যা-১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮